শনিবার, ২৭ Jun ২০২৬, ০৪:৩১ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

‘মুল্লুকে চলো’র শতবর্ষ

শতবর্ষ আগে ১৯২১ সালের ২০ মে ‘মুল্লুকে চলো’ আওয়াজ তুলে আসাম ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগানের ৩০ হাজার ‘কুলি-কামিন’ চাঁদপুরে জমায়েত হয় স্টিমারে চেপে আপন মুল্লুক অর্থ্যাৎ নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য। বাগানের মালিক পক্ষ এতে বাঁধ সাধে। শ্রমিকরা স্বভূমে ফিরলে যে ব্যহত হবে বাগানের উৎপাদন!

তাই বাগানমালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী ব্রিটিশ গুর্খা রেজিমেন্টের সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায় সমবেত শ্রমিকদের ওপর। হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয় শত শত কুলি-কামিনের। আহত হয় আরও হাজারে হাজার।

শতবর্ষ আগের চা শ্রমিকদের স্বভূমে ফিরে যাওয়ার এই আন্দোলনই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয় ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন হিসেবে।

ব্রিটিশ কোম্পানির উদ্যোগে আসামে চা চাষ শুরু হয় ১৮৩৯ সালে। বাংলায় পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামে প্রথম চা বাগান স্থাপিত হয় ১৮৪০ সালে। তবে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায়।

জঙ্গল পরিষ্কার করে স্থাপন করা হতো চা বাগান। স্থানীয়রা করতে চাইতো না কঠিন এই কাজ। তাই দারিদ্র্যপীড়িত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষদের উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে আনা হতো চা বাগানে। এতে করে বিহার, মাদ্রাজ, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ এসেছে চা বাগানে। কিন্তু সুদীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে বাগানে তারা পায় দুর্বিসহ পরিবেশে কঠিন এক কাজ।

তারা এসেছিল এক সুবর্ণভূমির খোঁজে, যেখানে পাহাড়ঘেরা সুন্দর বাগানে গাছে-গাছে খাঁটি সোনার পাতা! সে গাছে কেউ ঝাঁকি দিলেই ঝরে পড়ে রাশি রাশি স্বর্ণপত্র! এমনই জনশ্রুতি ছড়িয়ে চা বাগানে কাজের জন্য আকৃষ্ট করা হতো দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্ঠীকে।

রুপকথার মতো এক জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে সুদীর্ঘ-ক্লান্তিকর পথ পেরিয়ে পীড়িত মানুষের দল যেন তপ্ত কড়াই থেকে এসে পড়ে জ্বলন্ত উনুনে। কথিত সুবর্ণভূমে পৌঁছে তারা পরিণত হয় ‘কুলি-কামিনে’, বাগান মালিকের সম্পত্তিতে। দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি আর দুর্বিসহ কর্মপরিবেশে তাদের এক-তৃতীয়াংশই প্রাণ হারায়। ব্রিটিশ লেখক ড্যান জোনসের ‌‘টি অ্যান্ড জাস্টিস’ বইয়ে চা শ্রমিকদের জীবনের এমনই এক নিদারুণ চিত্র পাওয়া যায়।

চা গাছ সারাক্ষণ ছেঁটে রাখতে হয়। ২৬ ইঞ্চির বেশি বাড়তে দেয়া হয় না। চা শ্রমিকের জীবনও যেন ছেঁটে দেয়া চা গাছের মতোই! লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের একটা কুঁড়েঘরে মধ্যযুগীয় ভূমিদাসের মতো চা বাগানের গন্ডিতেই বাঁধা পড়া ছিল তাদের জীবন। পুরুষানুক্রমে তারা কুলি-কামিনের জীবন যাপন করে আসছে। চা শ্রমিকের পরিচয়ই যেন তাদের নিয়তি।

ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’র শতবর্ষ পরে বর্তমান সময়ে চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য মতে দেশে নিবন্ধিত চা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার। এছাড়াও আরও প্রায় ৪০ হাজারের মতো রয়েছে অনিয়মিত শ্রমিক। ৮৬০ টাকা সাপ্তাহিক মজুরীতে কাজ করেন শ্রমিকেরা।

ব্রিটিশ শাসনামল শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও ফুরোয়নি চা শ্রমিকদের দুর্ভোগ। স্বাধীন বাংলাদেশে চা শিল্প অন্যতম একটি বৃহৎ শিল্প। জাতীয় অর্থনীতিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবুও এ শিল্পের শ্রমিকদের সুদীর্ঘকালের বঞ্চনার অবসান এখনও হয়নি।

চা বাগানের জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়া। এসব ভূমিতে প্রজন্মান্তরে বসবাস করলেও শ্রমিকদের তাতে নেই কোনো অধিকার। তাই এই ভূমিতে নিজেদের অধিকারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন চা শ্রমিকরা। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার তাদের আবাসস্থল নিজ নিজ মালিকানায় করে দিবে বলে আশ্বাস দিলেও এখনও এর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।

আবাসস্থলের সমস্যা ছাড়াও শ্রমিকদের জন্য এখনও নেই পর্যাপ্ত পানীয় জল ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। বাগানের হাসপাতালে নেই নুন্যতম চিকিৎসার সুযোগ।

চাঁদপুরে যে স্থানে চা শ্রমিকদের ওপর গুলি চলেছিল, সেখানে আজও নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। পূর্বপুরুষের আত্মদান স্মরণে সে স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০ মে কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ ঘোষণার দাবি চা শ্রমিক সংগঠনগুলোর।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com