সোমবার, ২৯ Jun ২০২৬, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বললেও থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সংঘাত চলছেই ওমান উপসাগরে ট্যাঙ্কার জব্দ, ইরানে বাংলাদেশিসহ ১৮ ক্রুকে আটক মুক্তিযুদ্ধ ও ৭১ বাদ দিয়ে কোনো চেতনা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল নয়: শামীম হায়দার ষড়যন্ত্র চলছে, নির্বাচন অতো সহজ হবে না : তারেক রহমান হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত, মালিক গ্রেফতার দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ সুদানে জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা, ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত জাপানে জোট সরকার গড়তে রাজি এলডিপি, ইশিন হামাস যুদ্ধ বিরতির লঙ্ঘন ঘটিয়েছে অভিযোগ করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখো মানুষের ঢল

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কালজয়ী গানের গল্প

গাজী মাজহারুল আনোয়ার। গীতিকার, চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই বিখ্যাত গান ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’-এর গীতিকার তিনি। এ ছাড়া অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান লিখেছেন তিনি। তার লেখা গানের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি, পৃথিবীতে যা বিরল। গত রবিবার সকালে তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।

নিজের বর্ণাঢ্য সংগীত ক্যারিয়ার বিভিন্ন সময় দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই কিংবদন্তি গীতিকবি। তাতে উঠে এসেছে তার কালজয়ী কিছু গান লেখার পেছনের গল্প। তিনি বলেন, ‘সময়ের তাগিদেই গান লেখা শুরু করেছিলাম। সময়টা ছিল সংগ্রামের। অধিকার আদায়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র যে যার মতো আন্দোলন করছেন। অনুভব করলাম আন্দোলনে নামার তাগিদ। কলমটাকে মাধ্যম করে জড়িয়ে গেলাম আন্দোলনে। মুক্তিযুদ্ধের আগে বেশ কিছু ছবির প্রযোজনা করেছিলাম। সেই সুবাদে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সরাসরি মিশে ছিলাম। ছবির জন্যই লিখেছিলাম, “জয় বাংলা বাংলার জয়/ কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধ রাতে…” আনোয়ার পারভেজ সুর করেছিল এ গানের। অবশ্য ছবির গান বললে কিছুটা ভুল হবে। কারণ, এ গানের জন্যই “জয় বাংলা” ছবির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রথম দিকেই এই গান মুক্তিযুদ্ধের থিম সংয়ে পরিণত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতারের অধিবেশন শুরু হতো এ গানের মাধ্যমে, শেষও হতো এটা বাজিয়ে। সারা দিনই প্রায় বাজত। চারদিকে যুদ্ধ। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। চট্টগ্রাম, সীতাকুন্ড, কুমিল্লা। এর মধ্যেই প্রতিদিন তৈরি হতো গান। সময়টাই যেন ছিল গান লেখার প্রেরণা। কলমকে অস্ত্র বানিয়েই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম আমি।’

এরপর লিখলেন ‘হে বন্ধু বঙ্গবন্ধু’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’, ‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয়’সহ বেশ কিছু গান। সত্য সাহার সুরে ‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয়’ এবং খন্দকার নুরুল আলমের সুরে ‘একতারা তুই দেশের কথা’ গানগুলো সে সময়ই অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল। তিনি বলেন, ‘কিছু গান আমি গদ্যাকারে লিখেছিলাম, গানে গানে ফুটে উঠেছিল সেই সময়ের খন্ডচিত্র। যেমন বউ যায়গো পালকি চড়ে…দুরুম দুরুম গ্রেনেড ফুটছে, কাঁপছে তার বুক, মুক্তির নেশায় তবুও সে উন্মুখ। বলা যায়, গানগুলো যেন একেকটা মিউজিক ভিডিও। আরও আছে এমন “বাছারে বাছা তুই আরেকটা দিন বাড়িতে থেকে যা, উড়কি ধানের মুড়ি এখনো হয়নি শেষ, এমনই করে রাখত ধরে আমার মা” গানগুলো কাল্পনিক নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যা দেখেছি, তা-ই লিখেছি। একাত্তর সালের পর আমাদের চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। আমার গানেও এর প্রভাব পড়েছিল। “আমায় একটি ক্ষুদিরাম দাও বলে কাঁদিস নে মা…” “ওরা ১১ জন” ছবির জন্য লেখা আমার তেমনি একটি গান। সময়টা ছিল খুব অস্থির। সবকিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া। গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরে চলে আসছিল। যান্ত্রিকতা এসে যাচ্ছিল সবকিছুতে। জীবনের তাগিদে আমিও ছিলাম শহরে। গ্রামের জন্য মনটা কাঁদত। ওই সময় আমার আবেগ ফুটে উঠেছে আমার লেখা গানে “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনারগাঁয়ে”, “আমায় যদি প্রশ্ন করো” ইত্যাদি গান সেই সময়ে লেখা। চলচ্চিত্রে আমার গান লেখা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের আগেই। এক বিকেলে সত্য সাহা বললেন ছবির জন্য গান লিখতে। সে রাতেই লিখেছিলাম, “আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল…” পরদিন সত্যদার কাছে নিয়ে গেলে তিনি দেখে বললেন, “তোরে দিয়া হইব।” চলচ্চিত্রে প্রথম গান লিখেছিলাম “আয়না ও অবশিষ্ট” ছবির জন্য। ওই সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে লেখা। তবে আমি কখনো একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে থাকিনি। বলা চলে, আমি গান নিয়ে গবেষণা করেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার গানের বিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন ধারায় আমি লিখেছি। আমার গানে আধ্যাত্মিক প্রভাব এসেছে। “আছেন আমার মুক্তার, আছেন আমার বারিস্টার” কিংবা রথীন্দ্রনাথ রায়ের গাওয়া “সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে” গানগুলো আমার নিজেরই বিশেষ পছন্দের। বাউলগানের প্রভাবে লিখেছিলাম, “আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন আইলোরে…”। বৈষ্ণব, কীর্তন, সর্বোপরি রাধা-কৃষ্ণের প্রভাবে লিখেছি, “সাধকে মনমোহন হরি গোপীজন, মন চায় বাসরী”। তবে কঠিন শব্দ বসিয়ে গান লেখার পক্ষে আমি নই। গান হতে হবে সর্বজনীন। যারা শুনবে, তারা সহজেই যাতে বুঝতে পারে। আমার লেখা ২০ হাজারের অধিক গানের বেশির ভাগই এ পর্যায়ে পড়ে।

‘গান লেখার পাশাপাশি ছবি পরিচালনা এবং প্রযোজনার কাজও করেছি দীর্ঘদিন। প্রথমে অবশ্য প্রযোজনার দায়িত্বেই ছিলাম। ১৯৬৯ সালে “সমাধান” ছবির মাধ্যমে এ যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৩৩টি ছবি আমার প্রযোজনায় হয়েছিল। আর পরিচালনার কাজটুকু আমি আরও গুরুত্বের সঙ্গেই করেছিলাম। “সন্ধি”, “স্বাক্ষর”, “স্বাধীন”, “ক্ষুধা”, “সমাধি”, “স্বীকৃতি”, “পরাধীন” ইত্যাদি ছবি আমি পরিচালনা করেছিলাম। আমার পরিচালিত সর্বশেষ ছবি “আর্তনাদ”। এখন কাজ কমিয়ে দিয়েছি। এ মুহূর্তে পরিবেশ নেই বলেই আমার ধারণা। আমি আশাবাদী। আবার সুস্থ ছবির দিন আসবে। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়। তবে গান লেখাটাই আমার প্রথম লক্ষ্য। স্বীকৃতিও পেয়েছি গান লিখে। সবচেয়ে বেশি পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা। স্বাধীনতার পর গীতিকার হিসেবে প্রথম রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক লাভ করি। ২০০২ সালে একুশে পদকসহ বেশ কয়েকবার জাতীয় পুরস্কার পাই।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com