সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬, ০২:০৬ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : বনানীতে চীনা নাগরিক গাউজিয়ান হুইকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনায় দুই সিকিউরিটি গার্ডকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন আব্দুর রউফ (২৬) ও এনামুল হক (২৭)। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মঙ্গলবার তাদের বনানী থেকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন, টাকার জন্যই তারা চীনা নাগরিককে হত্যা করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে লুট করা ১ লাখ সাড়ে ২১ হাজার টাকা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত গামছা, বালতি, গর্ত খোঁড়ার কাজে ব্যবহূত কাঠের টুকরা ও নিহত চীনা নাগরিকের ব্যবহূত একটি ভাঙা মোবাইল।
ডিবি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের গতকাল চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল এসব তথ্য জানান মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন।
স্বজনদের কান্না: সংবাদ সম্মেলনের আগে বেলা সাড়ে ১১টায় ২০-২৫ জন চীনা নাগরিক মিডিয়া সেন্টার উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন নিহত হুইর স্ত্রী লিউ হুই ও দুই ছেলেমেয়ে। ডিবি গণমাধ্যমের সামনে হত্যার বর্ণনা দিতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী লিউ হুই। ব্রিফিং চলাকালে তার ছেলে এবং মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ব্রিফিং শেষে যখন মাটিচাপা থেকে উদ্ধারের ফুটেজ দেখানো হয় তখন তার পুরো পরিবার ও আত্মীয়স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।
যে কারণে হত্যা করা হয়: প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, গ্রেফতার দুজন বনানীর ২৩ নম্বর রোডের ৮২ নম্বর বাসার সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা ঐ বাসায় বসবাসকারী বিত্তবান লোকদের জীবনযাত্রা আর নিজেদের দৈন্যদশা দেখে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় কীভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করা যায় তা ভাবতে থাকেন। ঐ ভাবনা থেকেই কয়েক দিন আগে রউফ প্রস্তাব দেন যে, চীনা নাগরিক অনেক বড়ো ব্যবসায়ী, অনেক টাকা পয়সা নিয়ে চলাফেরা করে এবং ফ্ল্যাটে একা থাকেন। তাকে শেষ করে দিয়ে যা নেওয়া যাবে, তা দিয়ে জীবনে কিছু করা যাবে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এদিকে তারা নিশ্চিত হন যে, বিল্ডিংয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাতে ভিডিও রেকর্ড হয় না। কারণ, সেটির হার্ডডিস্ক নেই। গত ৬ ডিসেম্বর একবার তারা গাউজিয়ান হুইকে হত্যার চেষ্টা করেন। ঐদিন তারা সন্ধ্যায় গাউজিয়ান হুইর ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে কলিং বেল বাজান। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা না খোলায় ভয়ে তারা আবার ফিরে আসেন। এরপর গত ১০ ডিসেম্বর তারা পুনরায় পরিকল্পনা করেন যে, ঐদিনই কাজ শেষ করতেই হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এনামুল তার নিজের ব্যবহূত গামছা সঙ্গে নিয়ে যান। মাগরিবের আজানের পরেই তারা ফ্ল্যাটের সামনে যান এবং রউফ কলিং বেলে চাপ দেন। গাউজিয়ান হুই দরজা খুলে তাদের দিকে বিস্ময়ে তাকান। তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষার একটিও জানতেন না। তবে ইশারায় জানতে চাচ্ছিলেন যে, কি বিষয়? তখন এনামুল বলেন, ওয়াটার ওয়াটার। মুহূর্তের মধ্যেই তারা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
যেভাবে হত্যা করা হয়: অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ঘরে ঢোকার পর এনামুল গাউজিয়ানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন এবং রউফ কোমরের দিকে জাপটে ধরেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গাউজিয়ান হুই রউফের বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে কামড় দেন। এরপর তারা মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পাশেই ছিল সার্বক্ষণিক সঙ্গে রাখা থাকা ছোটো একটি ব্যাগ। রউফ ব্যাগটি খুলে সেখানে থাকা টাকার বান্ডিল, কিছু খুচরা টাকা ও মোবাইল নিজেদের হেফাজতে নেন। এরপর মৃতদেহটি ড্রয়িং রুমে নিয়ে গামছা দিয়ে রক্ত মুছে বের হয়ে ছাদে চলে যান। ছাদে যাওয়ার পর গামছা ধুয়ে ও নিজেরা গোসল করে একসাথে দুজন বের হয়ে যান। পরে তারা টাকা গণনা করে ভাগ করে নেন। এর মধ্যে রউফ নেন ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আর এনামুলকে দেন ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। এর পর তারা বনানী সুপার মার্কেটের পাশে একটি চায়ের স্টলে বসে চা পান করেন।
আব্দুল বাতেন বলেন, রউফ সুপার মার্কেটের আশেপাশে থাকা তিনটি বিকাশের দোকান থেকে বিকাশের মাধ্যমে তার গ্রামের বাড়িতে বন্ধু হাসানের কাছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। এনামুল চারটি বিকাশের দোকান থেকে তার নিজের বিকাশে ৫০ হাজার টাকা, এলাকার বড়ো ভাই করিমের (মিরপুরে বাড়ির ম্যানেজার) কাছে ৫০ হাজার টাকা, বন্ধু শাহীনের কাছে ৪০ হাজার হাজার টাকা এবং তার মেজো ভাবীর কাছে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন।
তিনি বলেন, ঐদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে রউফ সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে ডিউটি করেন। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে রউফ বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে কাঠের টুকরো দিয়ে বালু মাটিতে একটি গর্ত করেন। পরে তিনি এনামুলের সহায়তায় লিফট ব্যবহার করে লাশ মাটি চাপা দেন। পরের দিন গাউজিয়ানের ড্রাইভার ও গৃহকর্মী তাকে বাসায় না পেয়ে এবং তার ব্যবহূত সেন্ডেলে রক্তের দাগ দেখে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এক পর্যায়ে ড্রাইভার সুলতান বিল্ডিংয়ের পেছনে মাটিচাপা অবস্থায় পায়ের গোড়ালি দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে।
মামলার তদারকি কর্মকর্তা উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, মামলাটি তদন্তকালে কোনো প্রযুক্তির সহায়তার সুযোগ ছিল না। তবে পারিপার্শিক অবস্থা যাচাই বাছাই করে ঘটনার পর থেকে দুই সিকিউরিটি গার্ডকে আমরা ফলো করতে থাকি। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তারা ছিল পুরোপুরি স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এনামুল হকের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। আর আব্দুর রউফের বাড়ি নড়াইলে।
গত ১১ ডিসেম্বর সকালে বনানীর বাড়ির ফাঁকা জায়গার মাটি খুঁড়ে গাউজিয়ানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ঐ ফ্ল্যাটে দীর্ঘ ১ বছর যাবত্ বসবাস করতেন। তিনি চীন থেকে পাথর ও নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করে পদ্মাসেতু ও পায়রাবন্দরে সরবরাহ করতেন বলে ডিবি পুলিশ জানতে পেরেছে।
নগরকন্ঠ.কম/এআর