মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন
ক্রাইস্টচার্চের রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার ও দলের অন্য সফরসঙ্গীরা। নেই শুধু অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। অবশ্য এই চিত্র ভিন্ন নয়। সাকিব দলের সঙ্গে যোগ দেবেন ম্যাচের আগের দিন এবং ম্যাচ খেলেই একা উড়াল দেবেন, এটাই এখন বাংলাদেশ দলের নিয়মিত দৃশ্য।
আরও একটা দৃশ্য নিয়মিত হয়ে উঠেছে, সেটা হচ্ছে সাকিবের ব্যাটিং ব্যর্থতার। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর থেকেই সাকিবের ব্যাটিংটা আর আগের মতো নেই। ২০১৯ বিশ্বকাপে দুই সেঞ্চুরি আর পাঁচ হাফসেঞ্চুরিতে ৬০৬ রান করেছিলেন সাকিব। সেই তিনি ক্রিকেটে ফেরার পর শতরানের দেখা পাননি কোনো ফরম্যাটে, অথচ নেই নেই করেও তো সাতখানা টেস্ট, ১৫টা ওয়ানডে আর ২৫টা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছেন। ঘরোয়া আর ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের টি-টোয়েন্টির সংখ্যা যোগ করলে পঞ্চাশের কাছাকাছিই হবে। বোলিংয়ে ধারটা আগের মতো আছে, তবে ব্যাটিংটা ভোগাচ্ছে সাকিবকে যার প্রমাণ সবশেষ ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। ম্যাচ খেলেছেন ৬টা, ব্যাটিং করেছেন সবগুলো ম্যাচেই এবং সেটাও নিয়মিত চার নম্বর পজিশনে। কিন্তু একটা ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি বাদে বাকি ইনিংসে বলার মতো রান নেই। প্রথম দুটো ইনিংসে গোল্ডেন ডাক, আর দুই কোয়ালিফায়ারেও হাসেনি তার ব্যাট। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল মনে করছেন ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বাড়ায় অনুশীলনে সময় কম দিচ্ছে সাকিব যার প্রভাব পড়েছে ব্যাটিংয়ে।
নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর বাংলাদেশের হয়ে একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেছেন সাকিব, অংশ নিয়েছেন এশিয়া কাপেও। বড় আসরে জ্বলে ওঠার যে আগুন দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে, ২০২১ ও ২০২২ সালে এসে সেটা নিভু নিভু। গেল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে ওমান আর পাপুয়া নিউগিনিকে পেয়ে খানিকটা চড়াও হলেও হাফসেঞ্চুরি পাননি, সুপার টুয়েলভে বড় প্রতিপক্ষের সামনে সাকিব ছিলেন কোণঠাসা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেছেন ১০ রান, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ আর উইন্ডিজের বিপক্ষে ৯ রান করে আউট হওয়া সাকিব শেষ দুটো ম্যাচ খেলতে পারেননি চোটের কারণে।
এশিয়া কাপেও প্রথম পর্ব থেকেই আউট বাংলাদেশ, অধিনায়ক সাকিব দুটো ম্যাচে করতে পেরেছেন ১১ আর ২৪ রান। অথচ পছন্দের ব্যাটিং পজিশন তিনেই নেমেছিলেন তিনি। নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে একটাই মাত্র হাফসেঞ্চুরি সাকিবের, সেটাও কিছুদিন আগে উইন্ডিজের বিপক্ষে যে ম্যাচে ১৯৪ রান তাড়ার কোনো চেষ্টাই করেনি বাংলাদেশ! সাকিবের ৫২ বলে অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসটা স্রেফ ব্যবধান কমিয়েছে। টি-টোয়েন্টির টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট শ্রীধরন শ্রীরাম যে ইমপ্যাক্টের কথা বলে মুখে ফেনা তুলছেন তার ছিটেফোঁটাও ছিল না সাকিবের ব্যাটে।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে একটা সময় সাকিব ছিলেন নিয়মিত মুখ। এই বছর মেগা নিলামে দুটো দল বাড়লেও জায়গা হয়নি সাকিবের। আশরাফুল মনে করেন, সাকিবের ব্যাটিংটা খারাপ হওয়ার কারণেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আইপিএল দলগুলোÑ ‘সাকিবকে ওরা ব্যাটসম্যান মনেই করে না, বোলারই মনে করে। সাকিবকে ব্যাটিং দিত শেষের দিকে। অলরাউন্ডার হিসেবে ওকে আর কার্যকর মনে করছে না বলেই বোধহয় এবার আইপিএলে তাকে আর দলে নেয়নি কেউ।’
সাকিবের ব্যাটিংয়ে লিটন দাসের মতো নান্দনিকতা কিংবা মুশফিকুর রহিমের মতো দৃঢ়তা কখনই ছিল না। তবুও দারুণ হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন আর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং দিয়ে সাকিব অলরাউন্ডার হিসেবে উঠে এসেছেন শীর্ষে। যোগ-বিয়োগের অঙ্কে ওয়ানডের শীর্ষ অলরাউন্ডার র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থানটা ধরে রেখেছেন সাকিব, টি-টোয়েন্টিতে আবার তার সঙ্গে সাপ-লুডু চলছে আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবির। কখনো সাকিব কখনো নবি এভাবেই চলছে। তবে ক্রিকেটের ‘বক্স-অফিস’ আইপিএলের নিলামে যে মুখ থুবড়ে পড়েছেন সাকিব সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে সম্মিলিত উপেক্ষায়। কারণ অনুমিত। আন্দ্রে রাসেল, সুনীল নারিন, ম্যাক্সওয়েলরা যেভাবে একাই ব্যবধান গড়ে দিচ্ছেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে, সাকিব সেই জায়গাটাতে যেতে পারেননি ১০১টা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেও।
অবশ্য সাকিব জোর দিচ্ছেন মাঠের বাইরের পরিসংখ্যানে। নিত্যনতুন ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলছেন, ফুলে উঠছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। নামের পাশের রানের সংখ্যা না হয় নাইবা বাড়ল, সিপিএলে দুটো শূন্য বেড়েছে ঠিকই তবে ব্যাংক ব্যালেন্সে তো শূন্যের সংখ্যা বাড়ছে আরো বেশি করে!